প্রতিবন্ধীদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে পোশাক খাত

গাজীপুরের পশমি সোয়েটার লিমিটেডে কাজ করেন বেশ কয়েকজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ও পঙ্গু শ্রমিক। কাজের তুলনা করলে তারা স্বাভাবিক শ্রমিকের তুলনায় কোনো অংশেই কম যান না। বরং সমানে সমান। কিন্তু কারখানাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মসিউল আলম সজল প্রথম যখন এই শ্রমিকদের নিয়োগ দেন তখন কারখানার অন্য শ্রমিকরা নানা রকম কটুকথা বলে তাদের উত্ত্যক্ত করত। প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের মনোবল ধরে রাখতে তখন কারখানা কর্তৃপক্ষকেও বেশ কৌশলী হতে হয়। কিন্তু গত বছরের ভূমিকম্পে যখন কারখানাটির সব মানুষ জীবন বাঁচাতে নিচে নেমে এলো তখন স্বাভাবিক শ্রমিকদের কয়েকজন জীবনের মায়া ত্যাগ করে এই শ্রমিকদের কোলে করে কারখানা থেকে বের করে নিয়ে আসেন। কয়েকমাস আগেই প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের যারা কটুকথা বলত আজ তারাই এই শ্রমিকদের কাছের বন্ধু! শারীরিকভাবে অক্ষম, পক্ষঘাতগ্রস্ত, পঙ্গু, অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশে বেশকিছু পোশাক কারখানায় বর্তমানে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আছে কেয়া কম্পোজিট, বেক্সিমকো ফ্যাশন, পশমি সোয়েটার, অনুস গ্রুপ, ফেম সোয়েটার, স্পেকট্রা সোয়েটার, ফকরুদ্দিন টেক্সটাইল, ইনটারেস্ট অফ, ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও, অবন্তি কালার টেক্স, ফকির ফ্যাশন, পান্ডোরা সোয়েটার, তারাসীমা অ্যাপেরালস এবং গিভেন্সি গ্রুপসহ আরও কয়েকটি কারখানা। এর মধ্যে কেয়া কম্পোজিট লি. কর্তৃপক্ষ একাই ৮৫০ জন প্রতিবন্ধীর কাজের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। আর বেক্সিমকো ফ্যাশন-এ ৬শ’ জন এমন ব্যক্তির কাজের সুযোগ হয়েছে। বিভিন্ন পোশাক উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যদি কারখানাগুলো প্রতিবন্ধীদের উপযোগী করে তৈরি করা হয় এবং চলাফেরার জন্য র‌্যাম্প ও আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা করা যায় তবে শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা এসব কারখানায় আরও বেশি কাজ করতে উৎসাহ বোধ করবেন। জানা যায়, বেশকিছু শ্রমবান্ধব কারখানায় প্রতিবন্ধীদের কাজের সুবিধার্থে কারখানার যন্ত্রপাতিগুলো তাদের ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। মসিউল আলম সজল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, তার কারখানাগুলোতে শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের কাজের জন্য পাঁচ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা আছে। শিগগিরই এটি বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার কথা ভাবছেন তিনি। বর্তমানে তার একাধিক কারখানায় শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। তিনি বলেন, আমরা গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে এই মানুষগুলোকে নিয়ে কাজ করছি। তারা যে কোনো স্বাভাবিক মানুষের মতোই সমান কাজ করেন। দেশের ছয় লাখ এমন শারীরিক অক্ষম মানুষদের মধ্যে যদি কিছু মানুষেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় তবে তা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ‘দ্য সেন্টার ফর দ্য রিহেবিলেটশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি) এর ভেলরি টেইলরের অনুপ্রেরণায় এই মানুষগুলোকে কাজে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে উৎসাহিত হই। পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান জানান, জার্মান ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি (গিজ), সিআরপি এবং দ্য সেন্টার ফর ডিজএবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্ট এসব পক্ষঘাতগ্রস্ত মানুষকে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বর্তমানে কাজ করছে। এর মধ্যে মিরপুরের সিআরপি সেন্টারে অবস্থিত ইনক্লুসিভ জব সেন্টার (আইজিসি) প্রতিবন্ধীদের পরীক্ষা করে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়। আইজিসি এই চাকরি প্রত্যাশীদের বায়োডাটা তৈরি করে বিজিএমইএর সহায়তায় সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের চাকরির ইন্টারভিউর ব্যবস্থা করে। বিজিএমইএ, সিআরপি এবং জার্মানি সরকারের মধ্যে এ লক্ষ্যে চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত আড়াই বছরে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় ৫শ’র বেশি প্রতিবন্ধীকে কর্মউপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় শারীরিক ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ৯৭ জনকে পুনবার্সন করেছে সিআরপি। কারখানা মালিকরা জানান, সাধারণত শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের কাজের প্রতি মনোযোগী বেশি হন। এর বাইরে তারা ঘন ঘন কাজের স্থান পরিবর্তন করেন না। ফলে কর্তৃপক্ষ তাদের কাজের ব্যাপারে সন্তুষ্ট থাকেন।

http://www.bd-pratidin.com/first-page/2016/08/26/165627